মোঃ আব্দুর রাকিব's Post
Avatar

ইয়াহইয়া আইয়াশ : ইসরায়েলিদের দুঃস্বপ্ন ফিলিস্তিনিদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘আল-মুহান্দিস’ (প্রকৌশলী) নামে। অন্যদিকে ইসরায়েলি নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে তিনি ছিলেন এক দুর্ধর্ষ পলাতক। যাকে খুঁজে বের করতে বছরের পর বছর সর্বশক্তি নিয়োগ করেও তারা ব্যর্থ হয়েছিল। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও কর্মকর্তারা তাকে কখনও ‘ধূর্ত শেয়াল’, কখনও ‘হাজার মুখের মানুষ’, আবার কখনও ‘মোস্ট ওয়ান্টেড নাম্বার ওয়ান’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তিনি ফিলিস্তিনি প্রকৌশলী ইয়াহইয়া আবদুল লতিফ শাতি আইয়াশ। প্রথম ইন্তিফাদার সময় হামাসের সশস্ত্র শাখা ইজ্জুদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেডে যুক্ত হওয়ার পর তিনি সংগঠনটির অন্যতম শীর্ষ কমান্ডার ও সামরিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তার পরিকল্পনায় পরিচালিত একাধিক প্রাণঘাতী হামলায় বহু ইসরায়েলি নিহত ও আহত হয়। ফলে তিনি ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ১৯৯৬ সালের ৫ জানুয়ারি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত তাকে গুপ্তহত্যা করে। জন্ম ও বেড়ে উঠা ইয়াহইয়া আইয়াশ ১৯৬৬ সালের ৬ মার্চ পশ্চিম তীরের সালফিত জেলার রাফাত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল সাধারণ, ধর্মপ্রাণ ও গ্রামীণ জীবনধারায় অভ্যস্ত। তাঁর পিতা আবদুল লতিফ শাতি মাহমুদ আইয়াশ কৃষিকাজ ও পাথর খোদাইয়ের পেশায় যুক্ত ছিলেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত তিনি জর্ডান সেনাবাহিনীর পদাতিক বাহিনীতে স্বেচ্ছাসেবী সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি নিজ গ্রামে ফিরে এসে আগের পেশায় মনোনিবেশ করেন। পরবর্তীতে তিনি তাঁর আত্মীয়া আয়েশা আইয়াশকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির ঘরে তিন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেন—ইয়াহইয়া, মারয়ী ও ইউনুস। তিন ভাইয়ের মধ্যে ইয়াহইয়া ছিলেন জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই তিনি গ্রামীণ ও ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন। মাত্র চার বছর বয়স থেকেই মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় শুরু করেন। সমবয়সীদের তুলনায় তার স্বভাব ছিল শান্ত, ধীরস্থির ও পরিণত। তিনি ছিলেন বাবা-মায়ের খুব অনুগত। কৈশোরে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি খোলা ও জোড়া লাগানোর প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ তৈরি হয়। গ্রামের মানুষের নষ্ট বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিও তিনি মেরামত করে দিতেন। এই আগ্রহই পরবর্তীকালে প্রকৌশলবিদ্যার প্রতি তার অনুরাগ গড়ে উঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর তিনি তার খালাতো বোন হিয়াম আইয়াশকে বিয়ে করেন। ১৯৯৩ সালে তাদের প্রথম সন্তান বারারের জন্ম হয়। পরবর্তীকালে তাদের দ্বিতীয় পুত্র আবদুল লতিফের জন্ম হয়। বাবার স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে পরবর্তী সময়ে তার নাম পরিবর্তন করে ইয়াহিয়া রাখা হয়। শিক্ষা ও জ্ঞানার্জন ছয় বছর বয়সে ইয়াহইয়া আইয়াশ রাফাত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর নিকটবর্তী আল-জাবিয়াহ বিদ্যালয়ে নিম্ন-মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরবর্তী সময়ে বিদ্দিয়া গ্রামের বিদ্দিয়া হাইস্কুলে বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেন। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ৯২.৮ শতাংশ নম্বর পেয়ে তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দেন। তার পিতার ভাষ্য অনুযায়ী, শিক্ষাজীবনের প্রতিটি শ্রেণিতেই তিনি প্রথম স্থান অধিকার করতেন। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি ধর্মীয় জ্ঞানার্জনেও তার গভীর আগ্রহ ছিল। অল্প বয়স থেকেই পবিত্র কুরআন হিফজ ও ইসলামি শরিয়াহ অধ্যয়নে মনোনিবেশ করেন। একপর্যায়ে সম্পূর্ণ কুরআন হিফজ শেষ করে ফিলিস্তিনের ওয়াকফ মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক সনদ লাভ করেন। শরিয়াহর বিভিন্ন শাখায়ও তিনি অধ্যয়ন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথমে জর্ডানে যাওয়ার উদ্যোগ নিলেও শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে বিভিন্ন বিবরণে ভিন্ন ভিন্ন কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। কোনো বিবরণে নিরাপত্তাজনিত বাধার কথা বলা হয়েছে, আবার কোনো বিবরণে আর্থিক অসচ্ছলতার কথা উঠে এসেছে। পরবর্তীতে তিনি রামাল্লার নিকটবর্তী বিরজিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে একাধিকবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ও ধর্মঘটের কারণে তার পড়াশোনা ব্যাহত হয়। দীর্ঘ আট বছরের শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৯৩ সালের মার্চে তিনি ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনেই তার প্রকৌশলগত দক্ষতা ও প্রখর মেধার পরিচয় পাওয়া যায়। রাজনৈতিক ও সামরিক পথচলা ইয়াহইয়া আইয়াশের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় ছাত্রাবস্থায়। ১৯৮৪ সালের অক্টোবরে বিরজিত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের ছাত্রসংগঠন ‘আল-কুতলাতুল ইসলামিয়া’য় (ইসলামিক ব্লক) যোগ দেন। পরবর্তীকালে ১৯৮৫-১৯৮৬ সালের দিকে রামাল্লা অঞ্চলে মুসলিম ব্রাদারহুডের একটি সাংগঠনিক সেলের সঙ্গেও যুক্ত হন। ১৯৮৭ সালে প্রথম ইন্তিফাদা শুরু হলে ফিলিস্তিনের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসরায়েলি দখলদারত্বের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ ছড়িয়ে পড়ে। এই সময় ইয়াহইয়া আইয়াশ রাফাত অঞ্চলে ইসলামি আন্দোলনের একজন সক্রিয় সংগঠক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৮৮ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত তিনি স্থানীয় পর্যায়ে আন্দোলনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। একই সময়ে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে হামাসের সশস্ত্র শাখা ইজ্জুদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেডে যোগ দেন। প্রথম ইন্তিফাদার দিনগুলোতে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের সামনে অন্যতম বড় সংকট ছিল অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জামের অভাব। এই পরিস্থিতিতে তাঁর প্রকৌশলগত জ্ঞানকে সামরিক কাজে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তিনি বিস্ফোরক তৈরির সঙ্গে যুক্ত হন এবং পরবর্তীকালে কাসসাম ব্রিগেডের অন্যতম প্রধান বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ও সামরিক পরিকল্পনাকারী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। ১৯৯২ সালের শুরুর দিকে পশ্চিম তীরের একটি পাহাড়ি গুহায় তার প্রাথমিক বিস্ফোরক পরীক্ষার কথা বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম প্রচেষ্টা সফল না হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি সফল হন। এভাবেই প্রতিরোধ আন্দোলনের অভ্যন্তরে তিনি ‘প্রথম বিস্ফোরক প্রকৌশলী’ হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। তবে তার তৎপরতা দ্রুতই ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর নজরে আসে। ১৯৯২ সালে তেল আবিব অঞ্চলে একটি বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি বিস্ফোরণের ঘটনার পর থেকে তাঁকে বিশেষভাবে খুঁজতে শুরু করে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী। একপর্যায়ে তিনি তাদের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকার শীর্ষে চলে আসেন। উল্লেখযোগ্য অভিযানসমূহ ইয়াহইয়া আইয়াশের নামের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন অভিযান প্রথম ইন্তিফাদার শেষভাগ এবং পরবর্তী কয়েক বছরে ইসরায়েলি নিরাপত্তাব্যবস্থাকে ব্যাপক চাপে ফেলে। বিশেষ করে ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে পরিচালিত একাধিক আত্মঘাতী ও বিস্ফোরক হামলার পরিকল্পনার সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠে আসে। ১৯৯৩ সালের মার্চ-এপ্রিলে জর্ডান উপত্যকার মেহোলা বসতি এলাকায় ‘ভিলেজ ইন’ ক্যাফের কাছে একটি বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। ফিলিস্তিনি তরুণ সাহির হামদুল্লাহ তাম্মাম এই অভিযানে অংশ নেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এতে ইসরায়েলি সেনাসহ কয়েকজন হতাহত হয়। হামলাটিকে আইয়াশের পরিকল্পনায় পরিচালিত প্রথম দিককার উল্লেখযোগ্য অভিযানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ে বন্দিবিনিময়ের উদ্দেশ্যে একটি ইসরায়েলি বাস জিম্মি করার পরিকল্পনায় আইয়াশ ও তার সহযোগীরা ‘ফ্রেঞ্চ হিল অভিযান’ পরিচালনা করেন। অভিযানটি প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জনে সফল না হলেও ইসরায়েলি নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করে। ১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি হেবরনের ইবরাহিমি মসজিদে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী বারুখ গোল্ডস্টেইনের হামলায় কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি মুসল্লি নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ডের পর ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে প্রতিশোধমূলক অভিযানের ঘোষণা আসে। ইয়াহইয়া আইয়াশের পরিকল্পনায় কাসসাম ব্রিগেডও ধারাবাহিক হামলা পরিচালনা করে। ১৯৯৪ সালের ৬ এপ্রিল আফুলা শহরের কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে একটি বিস্ফোরকভর্তি গাড়ি বিস্ফোরিত হয়। ফিলিস্তিনি যোদ্ধা রায়েদ জাকারনা এই অভিযানে অংশ নেন। এতে আটজনের বেশি ইসরায়েলি নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়। এর এক সপ্তাহ পর, ১৩ এপ্রিল হাদেরা শহরে আরও দুটি বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আম্মার আম্মারনা নামের এক ফিলিস্তিনি যোদ্ধা একটি বাসস্টপে বিস্ফোরণ ঘটান। এতে সাতজন ইসরায়েলি নিহত হন এবং অনেকে আহত হন। একই দিনে সালিহ নাজ্জাল তেল আবিবের কেন্দ্রস্থল ডিজেনগফ স্ট্রিটে আরেকটি বিস্ফোরণ ঘটান। ওই ঘটনায় ২২ জন ইসরায়েলি নিহত হয়। ১৯৯৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জেরুজালেমে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর সদস্যদের বহনকারী একটি বাসের কাছে ফিলিস্তিনি পুলিশ কর্মকর্তা ও কাসসাম সদস্য ওসামা রাদি বিস্ফোরণ ঘটান। এতে ১৩ জন ইসরায়েলি সেনা আহত হয়। ১৯৯৫ সালের ২২ জানুয়ারি নেতানিয়ার নিকটবর্তী বেইত লিদ সামরিক ট্রানজিট পয়েন্টে ধারাবাহিক দুটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে ২৩ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং প্রায় ৪০ জন আহত হয়। একই বছরের ৯ এপ্রিল গাজার শেখ রিদওয়ান এলাকায় ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার হাতে একটি বাড়ি ধ্বংসের ঘটনার প্রতিশোধ হিসেবে আরেকটি হামলা পরিচালিত হয়। এতে সাতজন ইসরায়েলি নিহত হয়। ১৯৯৫ সালের ২৪ জুলাই তেল আবিবের নিকটবর্তী রামাত গান এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাসে বিস্ফোরণ ঘটে। আয়্যশের এক অনুসারীর পরিচালিত এই হামলায় ছয়জন নিহত ও ৩৩ জন আহত হয়। এর প্রায় এক মাস পর, ২১ আগস্ট অধিকৃত জেরুজালেমের রামাত এশকল এলাকায় আরেকটি বাসে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে পাঁচজন নিহত এবং শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। এসব ধারাবাহিক হামলার ফলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে গণপরিবহন, ক্যাফে ও জনসমাগমস্থলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছে আইয়াশ হয়ে এমন এক প্রতিপক্ষ, যাকে আটক করা তো দূরের কথা, নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়েছিল। পলাতক জীবন: ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দুঃস্বপ্ন ইয়াহইয়া আইয়াশকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয় ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেতকে। কিন্তু তার গোপনীয়তা বজায় রাখার অসাধারণ ক্ষমতা, দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন এবং সাংগঠনিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সতর্কতা গোয়েন্দাদের জন্য তাকে আটক করা অত্যন্ত কঠিন করে তোলে। শিন বেতের এক শীর্ষ কর্মকর্তা তাকে বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘তিনি অত্যন্ত চতুর ও ফাঁকিবাজ এক পলাতক। যিনি দ্রুত নিজের গোপন আস্তানা বদল করেন। তিনি যেন এক মায়াজাল বা দুঃস্বপ্ন; যতবারই আমরা তাঁর কাছাকাছি পৌঁছাই, মাটি যেন ফাঁক হয়ে তাঁকে গিলে ফেলে।’ তার আত্মগোপনের কৌশল নিয়ে নানা ঘটনা প্রচলিত রয়েছে। বিভিন্ন বিবরণে দাবি করা হয়, তিনি ছদ্মবেশ ধারণ করে একাধিকবার নিরাপত্তা তল্লাশি এড়িয়ে গেছেন। এমনকি ইহুদি ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের বেশ ধারণ করে চলাফেরা এবং নারীর পোশাকে আত্মগোপনের কথাও কিছু বিবরণে উঠে এসেছে। তবে এসব ঘটনার সবগুলোর স্বতন্ত্র প্রামাণ্যতা সমান নয়। ১৯৯৩ সালের দিকে তিনি পশ্চিম তীর থেকে গাজা উপত্যকায় চলে যান। সেখানে আত্মগোপনে থাকার পাশাপাশি কাসসাম ব্রিগেডের সদস্যদের সামরিক প্রশিক্ষণ ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। গাজায় তাঁর অবস্থান ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানকে আরও জটিল করে তোলে। তাকে ঘিরে ইসরায়েলি নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ কতটা গভীর ছিল, তা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনের একটি বক্তব্যে প্রকাশ পায়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, আইয়াশ হয়তো ছদ্মবেশে ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটের ভেতরেই তাদের সঙ্গে বসে আছেন! ইসরায়েলের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান ইয়াকভ পেরিও তাকে গ্রেপ্তার করতে না পারাকে দেশটির গোয়েন্দা ইতিহাসের অন্যতম বড় মাঠপর্যায়ের ব্যর্থতা হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। ইসরায়েলের তৎকালীন অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও আইয়াশের মেধা ও আত্মগোপনের দক্ষতা নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন। এমনকি তার কর্মকৌশল ও বারবার নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নিয়ে ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যেও বিস্ময় ও হতাশা তৈরি হয়েছিল। গুপ্তহত্যা: ৫ জানুয়ারি ১৯৯৬ দীর্ঘ অনুসন্ধান ও একাধিক ব্যর্থ অভিযানের পর অবশেষে ১৯৯৬ সালের ৫ জানুয়ারি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত ইয়াহইয়া আইয়াশকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। তাকে হত্যার পরিকল্পনায় ব্যবহার করা হয় তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন। তিনি যে ফোনের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন, বিশেষ করে পিতার সঙ্গে কথা বলতেন, সেই ফোনের ব্যাটারির ভেতরে গোপনে বিস্ফোরক স্থাপন করা হয়। ৫ জানুয়ারি পিতার সঙ্গে কথোপকথনের সময় দূরনিয়ন্ত্রিত সংকেতের মাধ্যমে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। এই হত্যাকাণ্ডে স্থানীয় এক সহযোগীর ভূমিকা ছিল বলে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোদ্ধা ওসামা হাম্মাদের মামা কামাল হাম্মাদ ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে হত্যার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছিলেন বলে অভিযোগ উঠে। পরবর্তীকালে ফিলিস্তিনি আদালতের তদন্তে ওসামা হাম্মাদকে নির্দোষ ঘোষণা করা হয় এবং দেশত্যাগী কামাল হাম্মাদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। ২০১৯ সালের নভেম্বরের শেষভাগে ইসরায়েলি সামরিক সেন্সরশিপ এই হত্যাকাণ্ডের কিছু গোপন নথি প্রকাশের অনুমতি দেয়। এরপর হিব্রু ভাষার টেলিভিশন চ্যানেল ১৩ আইয়াশের পিতার সঙ্গে শেষ কথোপকথন এবং বিস্ফোরণের মুহূর্তের অডিও রেকর্ড প্রচার করে। এর মধ্য দিয়ে হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছু অজানা দিক জনসমক্ষে আসে। ইয়াহইয়া আইয়াশের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে গাজা উপত্যকায় ব্যাপক শোকের সৃষ্টি হয়। তার জানাজায় লক্ষাধিক ফিলিস্তিনি অংশগ্রহণ করেন। তাকে ঘিরে ফিলিস্তিনি সমাজে যে আবেগ ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। তার মৃত্যুর পর কাসসাম ব্রিগেডসহ ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ সংগঠনগুলো প্রতিশোধমূলক অভিযানের ঘোষণা দেয়। পরবর্তী সময়ে ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থানে ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটে, যাতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়। আইয়াশের হত্যাকাণ্ড এভাবেই ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত অধ্যায়ে পরিণত হয়। স্মৃতি ও উত্তরাধিকার ইয়াহইয়া আইয়াশের জীবন, কর্মকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে পরবর্তী সময়ে বহু গ্রন্থ, গবেষণা ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে। তার জীবন নিয়ে রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে স্যামুয়েল এম. কাটজের ইংরেজি বই The Hunt for the Engineer বিশেষভাবে পরিচিত। এ ছাড়া গাসসান দুয়ারের আরবি গ্রন্থ আল-মুহান্দিস আশ-শহীদ ইয়াহইয়া আইয়াশ: রামযুল জিহাদ ওয়া কায়িদুল মুকাওয়ামাহ ফি ফিলিস্তিন এবং মুখলিস বারযাকের ফাদাইলুশ শহীদ ইয়াহইয়া আইয়াশ উল্লেখযোগ্য। তাকে স্মরণ করে ফিলিস্তিনি নির্মাতা বাসিল আল-খতিবের পরিচালনায় এবং ডায়ানা জাব্বুরের চিত্রনাট্যে ‘ইয়াহইয়া আইয়াশ’ নামে ১৫ পর্বের একটি টেলিভিশন ধারাবাহিক নির্মিত হয়। ২০১০ সালে রামাল্লা পৌরসভা শহরের একটি সড়কের নাম ‘ইয়াহইয়া আইয়াশ সড়ক’ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই সিদ্ধান্তে নাখোশ হয়। তার দপ্তর থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে এই নামকরণকে উসকানিমূলক ও ঘৃণ্য পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর নাম স্মরণে রাখতে ইজ্জুদ্দিন আল-কাসসাম ব্রিগেড তাদের তৈরি দূরপাল্লার রকেটের নাম দেয় ‘আইয়াশ-২৫০’। ২০২১ সালের মে মাসে গাজায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের সময় প্রথমবারের মতো তারা এই রকেট ব্যবহারের ঘোষণা দেয়। তাদের দাবি অনুযায়ী, রকেটটি দক্ষিণ নেগেভ অঞ্চলের রামন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে নিক্ষেপ করা হয়। প্রকৌশলী ইয়াহইয়া আইয়াশের জীবন ও মৃত্যু ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের ইতিহাসে বহুল আলোচিত একটি অধ্যায়। তার প্রকৌশলগত দক্ষতা, সাংগঠনিক ভূমিকা, ইসরায়েলি গোয়েন্দাদের দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং শেষ পর্যন্ত গুপ্তহত্যার ঘটনা তাকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাসে একজন আলোচিত ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। - মাওলানা মাহদী হাসান #Palestine #hamas #gaza

Translate to English
Post Image
0 Likes 0 Comments 6 Views
Ad

Comments (0)

Please Login to comment.