মদিনায় কথিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই যুদ্ধের বাইয়াত হয়েছিলো . [প্রথমেই স্পষ্ট করে নেই, রাষ্ট্র বলতে এই সময়ে আমরা যা বুঝি, মদিনা সেই অর্থে কোনো রাষ্ট্র ছিলো না। বরং রাষ্ট্রের একটা অংশ বলা যায়। যারা ইসলাম গ্রহণ করে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যার কারণে, রাজধানী তথা মক্কা থেকে বারবার তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে। যাইহোক, এখানে আপনার দ্বিমত থাকতেই পারে।] . মদিনায় হিজরতের পূর্বে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার মুসলমানদের থেকে দুইবার বাইয়াত নেন। এই দুই বাইয়াতেই উপস্থিত ছিলেন সাহাবী হযরত উবাদা ইবনে সামেত রা.। তো, হযরত উবাদাহ রা. এই দুই বাইয়াতের নামকরণ করছেন, একটিকে বাইয়াতুন নিসা বলে, আর অপরটিকে বাইয়াতুল হারব বলে। (দেখুন, মুসনাদে আহমদ, বর্ণনা নং ২২৭০০) সিরাত বিশেষজ্ঞ ইবনে হিশাম রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ২২২ হি.) বাইয়াতে আকাবায়ে সানিয়ার আলোচনা কালে শিরোনকম দেন, شُرُوطُ الْبَيْعَةِ فِي الْعَقَبَةِ الْأَخِيرَةِ সর্বশেষ আকাবার বাইয়াতের শর্তবলি। এরপর লেখেন, قَالَ ابْنُ إسْحَاقَ: وَكَانَتْ بَيْعَةَ الْحَرْبِ، حِينَ أَذِنَ اللَّهُ لِرَسُولِهِ (ﷺ) فِي الْقِتَالِ شُرُوطًا سِوَى شَرْطِهِ عَلَيْهِمْ فِي الْعَقَبَةِ الْأُولَى، كَانَتْ الْأُولَى عَلَى بَيْعَةِ النِّسَاءِ، وَذَلِكَ أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى لَمْ يَكُنْ أَذِنَ لِرَسُولِهِ ﷺ فِي الْحَرْبِ، فَلَمَّا أَذِنَ اللَّهُ لَهُ فِيهَا، وَبَايَعَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فِي الْعَقَبَةِ الْأَخِيرَةِ عَلَى حَرْبِ الْأَحْمَرِ وَالْأَسْوَدِ، أَخَذَ لِنَفْسِهِ وَاشْتَرَطَ عَلَى الْقَوْمِ لِرَبِّهِ، وَجَعَلَ لَهُمْ عَلَى الْوَفَاءِ بِذَلِكَ الْجَنَّةَ. ইবনে ইসহাক বলেন, এটি ছিল যুদ্ধের বায়আত। আল্লাহ যখন তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যুদ্ধের অনুমতি দিলেন, তখন এই বায়আতের শর্তগুলো আকাবার প্রথম বায়আতের শর্ত থেকে ভিন্ন ছিল। প্রথম বায়আতটি ছিল ‘“বায়আতুন নিসা”—অর্থাৎ নারীদের বায়আতের অনুরূপ। কারণ তখনও আল্লাহ তাঁর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে যুদ্ধের অনুমতি দেননি। অতঃপর যখন আল্লাহ তাঁকে যুদ্ধের অনুমতি দিলেন এবং শেষ আকাবায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সঙ্গে সাদা-কালো—অর্থাৎ সর্বপ্রকার মানুষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অঙ্গীকারে বায়আত করলেন, তখন তিনি নিজের জন্য কিছু শর্ত গ্রহণ করলেন এবং তাদের ওপর তাদের রবের পক্ষ থেকে কিছু শর্ত আরোপ করলেন। আর এসব শর্ত যথাযথভাবে পালন করার বিনিময়ে তাদের জন্য জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দিলেন। (দেখুন, সিরাত ইবনে হিশাম, ১/৪৫৪) . ইবনে রজব হাম্বলি রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৭৯৫ হি.) এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। তার পুরো কথার সারমর্ম হলো, এই দ্বিতীয় আকবার বাইয়াতে যে শর্তগুলো ছিলো, তাতেই এই বাইয়াতের নাম যে যুদ্ধের বাইয়াত তা যথাযথ বুঝে আসে। কেউ কেউ যুদ্ধের আলোচনা থাকার কারণে এই বাইয়াত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় যাওয়ার পর সংঘটিত হয়েছে বলে মত দিয়েছেন, যা সঠিক নয়। তিনি লেখেন, وهذه الرواية تدل على أن هذه البيعة هي بيعة الحرب وأن بيعة النساء كانت في العقبة الأولى قبل أن يفرض الحرب، فهذا قد يشعر بأن هذه البيعة كانت بالمدينة بعد فرض الحرب. وفي هذا نظر... এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, এই বাইআত ছিল যুদ্ধের বাইআত। আর নারীদের বাইআত হয়েছিল প্রথম আকাবায়—অর্থাৎ যুদ্ধের বিধান ফরজ হওয়ার আগেই। সুতরাং এ থেকে এমনটা মনে হতে পারে যে, এই (দ্বিতীয় আকাবার) বাইআতটি মদিনায় যুদ্ধ ফরজ হওয়ার পর সংঘটিত হয়েছিল। তবে এমনটি মতটা পর্যালোচনাযোগ্য। এই মতের পর্যালোচনা করে লেখেন, وخرج الإمام أحمد من وجه آخر، عن عبادة أنهم بايعوا النبي ﷺ هذه البيعة على السمع والطاعة، الحديث وقال فيه: وعلى أن ننصر النبي ﷺ إذا قدم علينا يثرب، فنمنعه مما نمنع منه أنفسنا . وهذا يدل على أن هذه البيعة كانت قبل الهجرة وذلك ليلة العقبة.... ইমাম আহমদ অন্য একটি সূত্রে উবাদাহ (রা.) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, তারা এই বাইআতে নবী ﷺ-এর কাছে শ্রবণ ও আনুগত্যের অঙ্গীকার করেছিলেন। হাদিসের বর্ণনায় আরও রয়েছে, “এবং আমরা এই অঙ্গীকারও করেছিলাম যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আমাদের কাছে ইয়াসরিবে আগমন করবেন, তখন আমরা তাঁকে সাহায্য করব এবং যে বিষয় থেকে নিজেদের রক্ষা করি, সে বিষয় থেকেই তাঁকেও রক্ষা করব।” এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, এই বাইআত হিজরতের পূর্বেই, আকাবার সেই রাতেই সংঘটিত হয়েছিল।’ কেনো এই বাইয়াতকে যুদ্ধের বাইয়াত বলাটা যথাযথ সে সম্পর্কে লেখেন, هذا المعنى من حديث جابر بن عبد الله أن هذه البيعة كانت للسبعين بشعب العقبة وهي البيعة الثانية، وتكون سميت هذه البيعة الثانية، بيعة الحرب، لأن فيها البيعة على منع النبي ﷺ وذلك يقتضي القتال دونه، فهذا هو المراد بالحرب وقد شهد عبادة البيعتين معا. ‘জাবির ইবন আবদুল্লাহ রা.-এর হাদিস থেকেও এ অর্থই প্রতীয়মান হয় যে, এই বাইআতটি ছিল আকাবার গিরিপথে সংঘটিত সত্তরজনের বাইআত—অর্থাৎ দ্বিতীয় আকাবার বাইআত। এটিকে “যুদ্ধের বাইআত” বলা হয়েছে এ কারণে যে, এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার অঙ্গীকার করা হয়েছিল; আর তাঁকে রক্ষা করার এই অঙ্গীকারের মধ্যে তাঁর পক্ষ হয়ে যুদ্ধ করার বিষয়টিও নিহিত ছিল। সুতরাং এখানে “যুদ্ধ” বলতে এ অর্থই বোঝানো হয়েছে। আর উবাদাহ রা. উভয়টি বাইআতেই উপস্থিত ছিলেন।’ (দেখুন, ফাতফুল বারি ইবনে রজব, ১/৭১, অধ্যায়: কিতাবুল ঈমান, ফাসলুন ফি উমুরিল ঈমান) . বাইয়াত থেকে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম কী বুঝেছেন? বাইয়াতের পরপরই একটা ঘটনা ঘটে যেটার পরিপ্রেক্ষিতে তখনই আব্বাস ইবনে উবাদাহ রা. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উদ্দেশ্য করে বলেন, والذي بعثك بالحق إنْ شئتَ لنميلَنَّ على أهلِ منًى غدًا بأسيافنا. ‘যিনি আপনাকে সত্যসহ পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম! আপনি চাইলে আগামীকালই আমরা মিনা প্রান্তরের লোকদের ওপর তরবারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারি।’ এটা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে শান্ত করে বলেন, «لم نُؤْمَرْ بذلك، ولكن ارجعوا إلى رحالكم» আমাকে এখনো এই বিষয়ে আদেশ দেওয়া হয়নি। তাই তোমরা তোমাদের তাবুতে ফিরে যাও। (দেখুন আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ, ৩/৪২২, অধ্যায়: কিসসাতু বাইয়াতিল উকবাতিস সানিয়াহ) . বাইয়াতের খবর শুনে মক্কার কুরাইশরা কী বুঝেছে? আকাবায়ে সানিয়ার এই বাইয়াত যে মক্কার মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বাইয়াত ছিলো, এটা মক্কার মুশরিকদের পরবর্তী আচরণ থেকেও একদম স্পষ্ট বুঝে আসে। তারা এই বাইয়াতকে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা হিসেবেই চিহ্নিত করেছেন। ইবনে কাসির রহিমাহুল্লাহ এই বাইয়াত পরবর্তী ঘটনা লেখেন এভাবে, فلما أصبحنا غدَتْ علينا جِلَّةُ قريش حتى جاؤونا في منازلنا فقالوا: يا معشر الخزرج، إنه قد بلغنا أنكم قد جئتم إلى صاحبنا هذا تستخرجونه من بين أظهرنا، وتبايعونه على حَرْبنا. وإنه واللَّه ما مِنْ حي من العرب أبغض إلينا من أن تنشبَ الحربُ بيننا وبينهم منكم. قال: فانبعث مَنْ هناك من مشركي قومنا يحلفون ما كان من هذا شيءٌ وما علمناه. قال: وصدقوا لم يعلموا. (আব্বাস ইবনে উবাদা রা. বলেন) সকালে কুরাইশের কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা আমাদের তাবুতে এসে বললো, “হে খাযরাজ সম্প্রদায়! আমরা জানতে পেরেছি, তোমরা আমাদের এই লোকটিকে আমাদের মাঝখান থেকে বের করে নিয়ে যাওয়ার জন্য এখানে এসেছ এবং আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অঙ্গীকার করে তার কাছে বাইআত করেছো। আল্লাহর কসম! আরবের আর কোনো গোত্রের সঙ্গে যুদ্ধ বেধে যাওয়া আমাদের কাছে যতটা অপছন্দনীয়, তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ বেধে যাওয়া তার চেয়েও বেশি অপছন্দনীয়।” হযরত আব্বাস ইবনে উবাদা রা. বলেন, তখন সেখানে উপস্থিত আমাদের সম্প্রদায়ের মুশরিকরা উঠে শপথ করে বলতে লাগলো, “এমন কিছুই হয়নি। আমরা এ ব্যাপারে কিছুই জানি না।” আসলেই তারা সত্যিই বলেছিলো। কারণ, তারা এ বিষয়ে কিছুই জানতো না।’ (দেখুন আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ, ৩/৪২২, অধ্যায়: কিসসাতু বাইয়াতিল উকবাতিস সানিয়াহ) © আব্দুল্লাহ বিন বাশির হাফিজাহুল্লাহ #jihad #modina
Log In to leave a comment.